• ঢাকা
  • সোমবার, ২১শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১১ই জিলকদ, ১৪৪২ হিজরি

রাত ৪:০৮

মরদেহে ৩ ঘণ্টার বেশি বাঁচে না করোনাভাইরাস


Share with friends

করোনা আক্রান্ত হয়ে কেউ মা’রা গেলে তার দেহে এ ভাইরাসটি তিন ঘণ্টার বেশি বেঁচে থাকতে পারে না। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যে কিছু সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ডব্লিউএইচওর নির্দেশনা অনুসরণ করে করোনভাইরাসে আক্রান্তদের মৃ’তদের কবর দেয়ার বিষয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই।

নরসিংদী সদর উপজে’লার আলোকবালী গ্রামের ৩০ বছর বয়সী সন্তানসম্ভবা গৃহবধূ সুলতানা বেগম জ্বর, কাশি এবং শ্বা’সক’ষ্টে আক্রান্ত হয়ে গত বৃহস্পতিবার মা’রা যান। করোনাভাইরাসের লক্ষণ নিয়ে তিনি মা’রা যাওয়ায় গ্রামবাসীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মা’রা গেছেন- এমন ভ’য়ে গ্রামবাসী তার ম’রদেহ দাফন করতেও বাধা দেয়। শেষে কবর দিতে না পেরে তার বৃদ্ধ বাবা ফরিদ মিয়ার পক্ষে মে’য়ের লা’শ মেঘনা নদীর তীরে একটি নৌকায় রেখে দেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।

এমন অবস্থায়, স্বাস্থ্য বিভাগের একটি দল এগিয়ে আসে। তারা স্থানীয় পু’লিশ সদস্যদের সহায়তায় ওই নারীর লা’শ দাফন করার সব ব্যবস্থা করেন।

নারায়ণগঞ্জের পোশাক কারখানার কর্মী সুলতানা বেগম এতটাই দুর্ভাগ্য নিয়ে এসেছিলেন যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মা’রা গেছেন- এ ভ’য়ে তার আত্মীয়স্বজন ও গ্রামবাসী স্বামী আমানউল্লাহকে স্ত্রী’র লা’শটি ছুঁয়ে দেখা বা শেষবারের মতো মুখটি দেখারও অনুমতি দেয়নি।

এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা এটাই প্রমাণ করে কী’ভাবে ম’রণঘাতী ভাইরাসের কারণে ঘটা মৃ’ত্যু মানবীয় স’ম্পর্ক এবং মানবাধিকারকে কেমন পরীক্ষার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে করোনাভাইরাসের লক্ষণ নিয়ে মা’রা যাওয়া মানুষের মৃ’তদেহ দাফন করতে বা লা’শ নিয়ে ঢুকতে বাধা দেয়া হচ্ছে। লা’শ থেকে ভাইরাসের সংক্রমণ এলাকায় ছড়িয়ে যেতে পারে এমন ভ’য় ও ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার কারণেই নি’হতদের দাফন করার বিষয়ে মানুষের এ অনীহা তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কিছু সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ডব্লিউএইচওর নির্দেশনা অনুসরণ করে করোনভাইরাসে আক্রান্তদের মৃ’তদেহ কবর দেয়ার বিষয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি তারা বলেছেন তা হলো করোনভাইরাস দীর্ঘ সময় ধরে মৃ’তদেহে বেঁচে থাকতে পারে না।

২৪ মা’র্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এ বিষয়ে কিছু নির্দেশনা জারি করেছে। তারা জানায়, এখন অবধি, কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে যারা মা’রা গিয়েছেন তাদের মৃ’তদেহের সংস্প’র্শে মানুষের আক্রান্ত হওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংস্থা আরও বলছে, নিরাপত্তা ও সুস্বাস্থ্যকে প্রথম অগ্রাধিকার দিয়ে প্রত্যেকের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জো’র দেয়া উচিত। প্রত্যেকের হাত রক্ষায় প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের (পিপিই) ব্যবস্থা নিশ্চিত করে আক্রান্তদের কাছাকাছি যাওয়া উচিত।

এতে আরও বলা হয়, কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে যারা মা’রা গেছেন তাদের কবর দেয়া বা দাহ করা যেতে পারে। তবে দাফন করা, এতে অংশ নেয়া ও লা’শ কবরে রাখার দায়িত্বে যারা থাকেন তাদের উচিত দাফন শেষ হওয়ার পরে হাতের গ্লাভস খুলে সাবান ও পানি দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়ে ফেলা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, ডব্লিউএইচও’র মতে, করোনাভাইরাস মৃ’তদেহে তিন ঘণ্টার বেশি বেঁচে থাকতে পারে না। তাই করোনভাইরাসে আক্রান্ত রোগী মা’রা যাওয়ার চার-পাঁচ ঘণ্টা পরে লা’শকে গোসল করানো এবং জানাজা বা দাফন দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, লা’শটি সাবান দিয়ে ভালো করে ধুয়ে নেয়া উচিত যাতে কোনো ভাইরাস থেকে না যায়। আমি মনে করি, সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম পরে কোনো করোনার রোগীর মৃ’তদেহ স্প’র্শ করা বা কবর দেয়া বা শ্মশানে নিয়ে যাওয়ায় কোনো ঝুঁ’কি নেই। এ নিয়ে মানুষের চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই।

অধ্যাপক কনক কান্তি বড়ুয়া আরও বলেন, সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে যারা লা’শের গোসল করানো বা লা’শ দাফনের কাজ করবেন তারা ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই), মুখের মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস এবং পলিথিন ব্যাগে পুরো শরীর ঢেকে রেখে এ কাজ করতে পারেন।

ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের (ডিসিএমসিএইচ) মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ বলেন, যদিও ডব্লিউএইচও বলছে যে, মৃ’তদেহে ভাইরাসটি কয়েক ঘণ্টা পরে মা’রা যায়, তারপরও লা’শগুলো নিয়ে কাজ করার সময় সতর্ক থাকতে হবে।

তিনি বলেন, লা’শের জানাজা ও দাফনের জন্য অল্প সংখ্যক মানুষকে সম্পৃক্ত করা উচিত।

এ চিকিৎসক বলেন, গোসল করানোর পরে লা’শটিকে পুরোপুরি সিল করা এবং অভেদ্য ব্যাগ দিয়ে আবৃত করে দেয়া উচিত এবং মানুষকে মৃ’তের মুখ দেখানোর জন্য খোলা ঠিক হবে না।

তিনি বলেন, ডব্লিউএইচও’র মতে করোনাভাইরাসে মা’রা যাওয়াদের কবর দেয়াই সবচেয়ে ভালো উপায় এবং কবরস্থান থেকে ভাইরাস ছড়িয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে, মানুষদের কবরস্থান জিয়ারত করা থেকে এসময় বিরত থাকা উচিত। মানে লোক সমাগম না করা।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, অনেক ভাইরাস এবং পরজীবী রয়েছে যেগুলো মৃ’তদেহে বেঁচে থাকতে ও বাড়তে পারে, তবে করোনাভাইরাস মৃ’তদেহে বাঁচতে পারে না।

তিনি বলেন, তাড়াহুড়ো না করে করোনায় মা’রা যাওয়া রোগীদের সমাহিত করতে কিছুটা সময় নেয়া উচিত।

ডা. জাফরুল্লাহ বলেন, প্রচলিত পদ্ধতিতে সাবান দিয়ে মৃ’তদেহের গোসল করাতে হবে। সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেললে ভাইরাসটি বেঁচে থাকতে পারবে না। তাই, করোনভাইরাসে মা’রা যাওয়াদের নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে, প্রত্যেকেরই সতর্ক থাকতে হবে এবং সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করতে হবে।

তিনি বলেন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে এবং নিরাপদে থাকার জন্য করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ছাড়া বেশি সংখ্যক মানুষ নিয়ে কোনো ব্যক্তির জানাজা পড়া ঠিক হবে না। যারা জানাজায় অংশ নেবেন তাদেরও সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম ও মাস্ক ব্যবহার করা এবং নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে নিরাপদ দূরত্ব মেনে চলতে হবে।

সূত্র: ইউএনবি।