• ঢাকা
  • শনিবার, ১৯শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ৯ই জিলকদ, ১৪৪২ হিজরি

বিকাল ৩:৩৫

লকডাউনে পেটের টান বদলে দিয়েছে পেশা, গৃহশিক্ষকরা আজ সবজি বিক্রেতা


Share with friends

করো’না ভাই’রাসের জন্য মাস খানেকের উপর রাজ্য জুড়ে লকডাউন। এই লকডাউনে সবচেয়ে সমস্যায় পড়েছেন সমাজের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। তাঁরা না পাচ্ছে বিনামূল্যে রেশন, না পাচ্ছে ত্রাণের লাইনে গিয়ে দাঁড়াতে। এই অবস্থা রাজ্যের উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম, সব জে’লাতেই। মাস খানেক ধরে রোজগার বন্ধ। এই অবস্থায় নিজের মুখে এবং পরিবারের মুখে দু’বেলা খাবার তুলে দিতে প্রশান্ত পাত্র, কানাই দাস, দীপক বেরা এবং খোকন বাড়ুই’রা বদলে ফেলেছেন তাঁদের পেশা। কেউ ছিলেন গৃহশিক্ষক, কেউ ছিলেন টোটো চালক, কেউ রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। আবার কেউ রিক্সাচালক। সাধারণ সময় এরা সবাই ভিন্ন ভিন্ন পেশায় যু’ক্ত থাকেন। লকডাউনে সবাই পেশা বদল করে এক পেশায়। কানাই , দীপক , প্রশান্ত সবাই এখন সবজি বিক্রেতা।

প্রশান্ত পাত্র। নন্দকুমা’র থা’নার অন্তর্গত শ্রীকৃষ্ণপুর এলাকার বাসিন্দা। নিজে উচ্চশিক্ষিত। এম এ (বিএড) হয়েও একটা চাকরি জোগাড় করতে পারেননি প্রশান্ত। তাই শ্রীকৃষ্ণপুর বাজারের কাছে একটি কোচিং সেন্টার খোলেন। এখানে পঞ্চ’ম থেকে দশম শ্রেণির ছাত্রছা’ত্রীদের পড়াতেন প্রশান্ত। প্রায় পঁচিশ জন ছাত্র এখানে পড়ে। তাদের পড়িয়ে কোনও রকমে সংসার চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু ছন্দপতন ঘটল লকডাউনে। পনেরো- কুড়িদিন ক’ষ্ট করে চালিয়ে নিলেও আর পারলেন না। জীবনযু’দ্ধের ল’ড়াইয়ে হার মেনে প্রশান্ত বদলে ফেললেন পেশা। শিক্ষক হলেন সবজি বিক্রেতা।

লকডাউনের জন্য কোচিং সেন্টার বন্ধ। আয় নেই। তাই সংসার চালাতে হলদিয়া-মেচেদা সড়কের পাশে শ্রীকৃষ্ণপুর বাসস্ট্যান্ডে কোচিং সেন্টারের সামনে কয়েকদিন ধরে সবজি বিক্রি করছেন শিক্ষক প্রশান্ত পাত্র। প্রথম দু’দিন একটু জড়তা ছিল। কিন্তু সৎ পথে আয়ের জন্য কোন কাজ ছোট নয়। ছোটবেলায় এই শিক্ষা পেয়েছেন প্রশান্ত। তাই এখন অনেকটা স্বাভাবিক। প্রশান্ত জানান, “পঁচিশ জন ছাত্রছা’ত্রী এখানে পড়ে। তা দিয়ে ছ’জনের সংসার কোনও রকমে চলে যেত। কিন্তু লকডাউনের জন্য কোচিং সেন্টার বন্ধ। কেউ পড়তে আসছে না । বেতন পাইনি । ঘরে যে কটা টাকা ছিল তা দিয়ে দিন কুড়ি চালিয়েছি। আর সম্ভব হল না। বাধ্য হয়েই সবজি বিক্রি করছি। এই কাজে ছাড় দিয়েছে সরকার। বেশিদিন হয়নি। তবে যেটুকু আয় হচ্ছে ক’ষ্ট করে চলে যাচ্ছে সংসার ।” তবে লকডাউন উঠে গেলে আবার পুরনো পেশা শিক্ষকতায় ফিরে যাবেন প্রশান্ত পাত্র ।

লকডাউনে একমুঠো খাবার জোগাড় করতে শুধু গৃহশিক্ষক নয় রাজ্যের বিভিন্ন জে’লার সব জায়গাতেই টৌটো চালক, রিক্সা চালক, রাজমিস্ত্রি-সহ একাধিক পেশার মানুষ হয়ে গেছে সবজি বিক্রেতা। কেন এক পেশায় সবাই ভিড় করেছে। এই প্রশ্নে শ্যামনগরের কানাই, ম’দনপুরের দীপক এবং হালিসহরের বিমলদের মুখে একই কথা, সবকিছু বন্ধ। কোন যাত্রী নেই। রাস্তায় টোটো-রিক্সা বার করে কোনও লাভ হচ্ছে না। লকডাউন চলাকালীন মাঝে কয়েকদিন বেড়নোয় পু’লিশের লা’ঠি পে’টায় সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে।

টোটো চালক বিমল বলেন, ‘ঘরে বসে থাকলে পরিবার নিয়ে না খেতে পেয়ে ম’রে যাব। আমাদের দৈনিক আয় । সেই ভাবে আম’রা চলে অভ্যস্ত। তাই ঠিক করলাম সবজি বিক্রি করব।” শ্যামনগরের কানাইয়ের কথায়, ‘লকডাউনে এই ব্যবসায় ছাড় আছে । আর আমাদের এখানে পঞ্চায়েত এলাকায় প্রচুর চাষ হয়। লকডাউনের আগে আম’রাই চাষীদের মাল পৌঁছে দিয়ে আসতাম। ওদের সাথে আমাদের পরিচয় আছে। তাই এই ব্যবসা করতে সুবিধা হল। দু’জন পুঁজি লাগিয়ে একটা ভ্যান ভাড়া করে সবজি বিক্রি করছি। আম’রা তো কোন বাজারে বসতে পারব না। তাই সকাল বিকেল বিভিন্ন পাড়ায় পাড়ায় সবজি করছি। দিনের শেষে যা আয় হচ্ছে দু’জনে ভাগ করে নিচ্ছি। লকডাইন বাড়ায় আরও অনেক পেশার মানুষ এই ব্যবসা করছে। সবাই এই ব্যবসায় চলে আসায় প্রথমে যে পয়সা আয় করতাম তা এখন আর হয় না । তবে চলে যাচ্ছে। না খেতে পেয়ে ম’রছি না।”