• ঢাকা
  • শনিবার, ১৯শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ৯ই জিলকদ, ১৪৪২ হিজরি

বিকাল ৩:৫০

বাংলাদেশে মে মাস হবে ভয়াবহ!


Share with friends

বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো করো’নাভাই’রাস শনাক্ত হওয়ার পর ৪৫ দিন পেরিয়ে গেছে। এ পর্যন্ত দেশে চার হাজারের বেশি করো’না রোগী শনাক্ত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক অন্যান্য দেশের সাথে তুলনা করে বলেন, এই সময়ে বিশ্বের অন্য দেশে যে হারে সংক্রমণ ছড়িয়েছিল তার তুলনায় বাংলাদেশে সংক্রমণের সংখ্যা কম।

তিনি বলেন, ‘প্রথম করো’নাভাই’রাস শনাক্ত হওয়ার পর ইতালিতে ৪৫ দিনে আ’ক্রান্ত হয়েছিল এক লাখ ৩০ হাজার। মা’রা গিয়েছিল প্রায় ১১ হাজার। স্পেনে একই সময়ে আ’ক্রান্ত হয়েছিল এক লাখ এবং মা’রা গিয়েছিল ১০ হাজার। যু’ক্তরাষ্ট্রে আ’ক্রান্ত হয় এক লাখ ২০ হাজার এবং মা’রা যায় ২৪ হাজার। সে তুলনায় বাংলাদেশের প্রথম ৪৫ দিনের অবস্থান ভালো।’

গত ৭ এপ্রিল কর্মক’র্তাদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এপ্রিল মাস নিয়ে আশ’ঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন।

তখন তিনি বলেন, ‘করো’নাভাই’রাস বিশ্বব্যাপী প্রলয় সৃষ্টি করেছে। সারা’বিশ্বে যেভাবে করো’না রোগী বৃদ্ধি পেয়েছে, আমাদের এখানেও বৃদ্ধি পাওয়ার একটা ট্রেন্ড আছে। তাতে আমাদের সময়টা এসে গেছে, এপ্রিল মাসটা। এই সময় আমাদের খুব সাবধানে থাকতে হবে।’

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অ’তিরিক্ত পরিচালক নাসিমা সুলতানা বলেন, এক মাস আগেও বাংলাদেশে করো’নাভাই’রাসে আ’ক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল মাত্র ছয়জন। আর এখন এই সংখ্যা চার হাজার ছাড়িয়েছে। সংক্রমণের দিক থেকে দেখতে গেলেও এপ্রিল মাসটি ক্রিটিক্যাল ছিল।

বাংলাদেশে করো’নাভাই’রাসে আ’ক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা বেশ কয়েক দিন ধরেই তিনশ বা চারশর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তাহলে কি এপ্রিল মাস ক্রিটিক্যাল ছিল না?

তবে করো’নাভাই’রাস সংক্রমিত বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে তুলনা করলে যে ধারণাটি পাওয়া যায় তা হলো এই সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ার কথা ছিল। একটা পর্যায়ে এসে এ সংখ্যা প্রতিদিন এক হাজার কিংবা দুই হাজারও হতে পারতো।

এই সংখ্যাটি কেন বাড়ছে না সে বিষয়ে চিন্তার অবকাশ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশে সংক্রামক রোগ নিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআর’র সাবেক পরিচালক ডা. বেনজীর আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে টেস্ট করানোর মেকানিজমটা এতো দিনে দাঁড়িয়ে যাওয়ার কথা ছিল এবং সেটা পুরোপুরি সচল হওয়া দরকার ছিল। এই পরীক্ষার মেকানিজম কতটা সচল সেটা একটা প্রশ্ন।

তার মতে, ‘যে নমুনাগুলো পরীক্ষা করা হচ্ছে বা যারা লক্ষণ নিয়ে পরীক্ষা করাতে যাচ্ছেন তারা যদি করো’নাভাই’রাস সংক্রমিত না হয়ে থাকেন তাহলে বলা হচ্ছে যে তার করো’না নেই। কিন্তু তাহলে তার মধ্যে লক্ষণগুলো অন্য কী’’ কারণে দেখা দিয়েছে সে বিষয়টি আর পরিষ্কার করা হচ্ছে না।’

করো’নাভাই’রাসের পরীক্ষায় নেগেটিভ আসার অনেকগুলো বিষয় রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলে নমুনা সংগ্রহ করা।

এ প্রসঙ্গে ডা. বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘নমুনা যখন সংগ্রহ করা হচ্ছে, সেগুলো সংরক্ষণ, পরিবহন এবং পরীক্ষার জন্য যখন ডিএনএ এক্সট্র্যাক্ট করা হচ্ছে সেই জায়গায় কোনও ঘাটতি আছে কিনা সেটা একটা ইস্যু।’

আরেকটি বিষয় হচ্ছে, পরীক্ষা করার সুযোগ মানুষ কতটা পাচ্ছে। অবশ্য আগের তুলনায় বাংলাদেশে কোভিড-১৯ এর পরীক্ষার সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। আগে মাত্র একটি ল্যাবে হলেও এখন ২১টি ল্যাবে এই পরীক্ষা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, এসব ল্যাবে পরীক্ষা করানোর সুযোগ সাধারণ মানুষ কতটা পাচ্ছে।

যাদের মধ্যে লক্ষণ বা উপসর্গ রয়েছে তারা পরীক্ষা করাতে যাচ্ছেন কি না বা তাদের মধ্যে কোন স্টিগমা আছে কি না সে বিষয়টি নিয়েও ভাবতে হবে। অনেকেই রয়েছেন যারা সামাজিকভাবে হেনস্থা হওয়ার ভয় থেকেই পরীক্ষা করাতে যাচ্ছেন না।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশে এমন অনেকের মধ্যেই করো’নাভাই’রাস শনাক্ত হচ্ছে যাদের মধ্যে কোনও উপসর্গ নেই।

একই ধরনের ধারা দেখা যাচ্ছে প্রতিবেশী দেশ ভা’রতেও।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর কারণে আমাদের দেশের অনেক আ’ক্রান্তের সংখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ তাদের মধ্যে ভাই’রাসের উপস্থিতি থাকলেও কোন লক্ষণ নেই।

ডা. বে-নজীর আহমেদ বলছেন, ‘এই কারণেই যে পরিমাণ রোগী রিপোর্টেড হওয়ার কথা ছিল সেটা হচ্ছে না। কারণ আন্ডার রিপোর্টিংটা বেশ বেশি।’

তিনি বলেন, ‘বলা হয়ে থাকে যে যত রোগী রিপোর্টেড হয় তার আট গুন রোগী এমনিতেই থাকে।’

এপ্রিল কি ক্রিটিক্যাল ছিল?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোন সময়টা ক্রিটিক্যাল কিনা সেটা দুই ভাবে দেখা যায়। একটি হচ্ছে সংক্রমণের সংখ্যা কতটা শনাক্ত হচ্ছে সেটা। আরেকটি হচ্ছে, এই সময়ে সংক্রমণ মোকাবেলায় কতটা পদক্ষেপ বা প্রস্তুতি নেয়া হয় সেটা।

এই দুটো দিক থেকেই এপ্রিলটা ক্রিটিক্যাল অবশ্যই ছিল। কারণ এ সময়টাতেই লকডাউন করে আন্ত:জে’লা যোগাযোগ বন্ধ করা হয়েছে। মানুষের যাতায়াত এবং রাস্তাঘাটে তাদের অবস্থান কম চোখে পড়েছে। মানুষ ঘরে থেকেছে। পরিবহন ব্যবস্থা বন্ধ করা হয়েছে।

বে-নজীর আহমেদ বলেন, সে হিসেবে লকডাউনটা বেশ ভালো কাজ করেছে এবং এটা খুব ভালো পদক্ষেপ ছিল।আর এ কারণেই ঢাকা থেকে সংক্রমণ গ্রামে তেমন একটা পৌঁছাতে পারেনি।

তবে একই এলাকার মধ্যে মানুষের চলাচল বা মানুষের কাছাকাছি আসার সুযোগ খুব বেশি একটা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। যার কারণে ভেতরে ভেতরে সংক্রমণ হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা আশ’ঙ্কা প্রকাশ করছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মতে, যখন আ’ক্রান্ত ব্যক্তির সংক্রমণের উৎস খুঁজে পাওয়া যায় না তখন সেটিকে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বলে ধ’রা হয়।

আরেকটি বিষয় হলো চিকিৎসকদের সুরক্ষার বিষয়টিতে ঘাটতি রয়ে গেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, এ পর্যন্ত করো’নাভাই’রাসে আ’ক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ১০ ভাগই হচ্ছে চিকিৎসক ও চিকিৎসা কর্মী। সেখানে একটা ব্যর্থতা রয়েছে।

মে মাসটি কি ‘ক্রিটিক্যাল’? বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, মে মাসের প্রথম দিকে সর্বোচ্চ সংক্রমণের সংখ্যা পাওয়া যাবে না। এটা আরো পরের দিকে হবে।

তারা মনে করেন, অর্থনৈতিক কর্মকা’ণ্ড যখন পুরোপুরি সচল হবে এবং পরিবহন ব্যবস্থা যখন চালু হবে, তখন বোঝা যাবে যে আসলে সংক্রমণ কতটুকু বাড়ছে।

তখন কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন এবং চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি সামনে আসবে।

সর্বোচ্চ সংক্রমণের সংখ্যা (পিক) মে মাসে হবে নাকি সেটি জুন মাস নাগাদ হবে, এটি বিশেষজ্ঞদের কাছে একটি বড় প্রশ্ন। পিক হলেও সেটা কতটা উচ্চতায় উঠবে? এই প্রশ্ন সামনের দিনগুলোতে এগুলো বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়াবে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন। এজন্যই তাদের দৃষ্টিতে মে মাসটি ক্রিটিক্যাল হতে পারে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান সাইফুল্লাহ মুনশি বলেন, করো’নাভাই’রাসের সংক্রমণ নিয়ে বাংলাদেশে কোনও প্রজেকশন করা হয়নি।

তিনি বলেন, একটা দেশের মধ্যে ডেমোগ্রাফি, স্বাস্থ্য সুবিধা এবং এপিডেমিওলজিক্যাল তথ্যের ভিত্তিতে একটা কার্ভ তৈরি করা হয়। যার মাধ্যমে জানা যায় যে, রোগের পিকটা কখন হবে।

তার মতে, বাংলাদেশে এটা করা হলে, এপ্রিল, মে নাকি অন্য কোনও সময় পিকটা হবে তার ধারণা পাওয়া যেতো। কিন্তু আমাদের সেটা করা হয়নি।

ডা. সাইফুল্লাহ মুনশি আরও বলেন, ‘মে মাসকে ক্রিটিক্যাল ধরতে হবে কারণ বর্তমানে সংক্রমণের সংখ্যা যে হারে বাড়ছে, সে হারেই যদি বাড়তে থাকে তাহলে মনে হচ্ছে যে, মে মাসে গিয়ে হয়তো একটা পিকে পৌঁছে যাবে।’

কারণ এখন প্রতিদিনই চারশ-পাঁচশ জন আ’ক্রান্ত হচ্ছে। এটা আরো বাড়বে বলেও আশ’ঙ্কার কথা জানান ডা. মুনশি।

সূত্র: বিবিসি বাংলা