• ঢাকা
  • রবিবার, ২০শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১০ই জিলকদ, ১৪৪২ হিজরি

রাত ৪:৩৮

বাঙালি ছেলে শেহ্ওয়ার ও রোমানিয়ান তরুণী মারিয়ার গল্প


Share with friends

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কিছুদিন আগ পর্যন্তও ভাবাই যেত না যে, ভিনদেশি কেউ মনের মানুষ হতে পারে। ভাবা গেলেও সে মানুষ যে তার জীবনসঙ্গীর বাঙালিয়ানাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবেই এমন বদ্ধমূল ধারণা ছিল আমাদের।

বদলেছে সময়, তাই সীমানার বাধাবিপত্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ডানা মেলছেন কেউ কেউ। দেশ ভিন্ন হলেই দুটো মন ভিন্ন হয়ে যাবে, এমন তো কোথাও লেখা নেই। আজ বলছি, একটা ব্যতিক্রমী গল্প। দুইটি ভিন্ন দেশের মানুষের অ’ভিন্ন সত্তায় একী’ভূত হওয়ার গল্প।

‘শেহ্ওয়ার-মা’রিয়া’, আপনি যদি সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাকটিভ হয়ে থাকেন তাহলে ইতোমধ্যে নিশ্চয়ই চিনে ফেলেছেন এই জনপ্রিয় জুটিকে।

পূর্বপরিচিত না হলে তাদের ভিডিও দেখার সময় আপনার মনে হতেই পারে এটা একটা স্ক্রিন প্লে। আসলে এটা কোনও মুভির স্ক্রিন প্লে নয়। এই নতুন দম্পতির সাংসারিক খু’নসুটির একটি নমুনা মাত্র।

যদিও তাদের গল্পটা সকলেই জানেন, তবুও আরেকবার ছোট করে বলছি। আ’লোচিত বাংলাদেশ-রোমানিয়ান এই জুটির প্রে’ম পর্বের শুরুটা ছিল দুজনের ‘মিউচুয়াল ফ্রেন্ড’ এর মাধ্যম। এভাবে কখন যে তারা নিজেদের অজান্তেই অনন্তকালের অটুট বন্ধনে জড়িয়ে পড়লেন সে কথা মনে নেই কারোই।

শেহ্ওয়ার একজন ন্যাটিভ বাঙালি ছে’লে। শৈশব ও কৈশোরকাল কে’টেছে বাঙলার মাটিতেই। উচ্চশিক্ষার জন্য ২০০৫ সালে চলে যান লন্ডনে। সেখান থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে, ইংল্যান্ডের খ্যাতনামা (সিআইপিডি) ডিগ্রি অর্জন। পৃথিবীর সেরা পু’লিশ ফোর্স হিসেবে বিবেচিত লন্ডন মেট্রোপলিটন পু’লিশ অফিসার হিসেবে কাজ করেছেন প্রায় ৫ বছর। বর্তমানে কর্ম’রত আছেন মানবসম্পদ বিভাগে। অন্যদিকে রোমানিয়ার প্লয়েশতি শহরে বেড়ে ওঠা মা’রিয়ার। ই’রাকের কুর্দিস্তানে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্ম’রত ছিলেন এই বাংলাপ্রে’মি তরুণী(২০১৩)।

এখন শেহ্ওয়ার পরিবার ও স্ত্রী’ মা’রিয়াকে নিয়ে অবস্থান করছেন লন্ডনে।

ভ্রমণ, রান্না, কথোপকথন, সাংসারিক খু’নসুটি ইত্যাদি বিষয়ে বিনোদনমূলক ও রোমাঞ্চকর ভিডিও করে থাকেন এই দম্পতি। আর সেসব সামাজিক মাধ্যমে আসা মাত্র দ্রুত ভাই’রাল হয়ে যায়। দেশের অসংখ্য মানুষের প্রধান আকর্ষণে থাকেন মা’রিয়া। রোমানিয়ান এই চ’মৎকার তরুণীর বাংলা ভাষার সাবলীল বাচনভঙ্গীতে মুগ্ধ হন সবাই।

এ স’ম্পর্কে শেহ্ওয়ারকে জিজ্ঞেস করা হলে, তিনি জানান- ‘আসলে আমা’র সাথে পরিচিত হওয়ার পর থেকেই দেখেছি, ওর মধ্যে বাংলা ভাষার প্রতি এক ধরনের মমতা কাজ করতো। সেখান থেকেই শুরু’ ।

ইউটিউব জার্নি -অর্জন সমগ্র

ইউটিউবে জনপ্রিয় এই দম্পতির ‘শেহওয়ার এন্ড মা’রিয়া’ নামক চ্যানেলে বর্তমান সাবস্ক্রাইবার ৩ লাখ ৩০ হাজার এর উপরে! প্রথম ভিডিও আপলোড দেয়ার ৩ মাসের মা’থায় ১ লাখ সাবস্ক্রিপশন ল্যান্ডমা’র্ক স্প’র্শ করেছিলেন তারা। মাস চারেক আগে পেয়েছেন ইউটিউব ক্যারিয়ারে কাঙ্ক্ষিত সম্মাননা সিলভা’র প্লে বাটন। মূলত লকডাউনের সময় থেকেই তাদের ইউটিবিং এর সূচনা। ১৪টি সেগমেন্ট নিয়ে বানানো ‘লক ডাউন ডায়েরি’ ভিডিও ব্লগটি দর্শকমহলে ইতিমধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ঘরে বসে ফ্রিতে লন্ডন শহর ঘুরতে চাইলে আপনিও চ্যানেলটি ভিজিট করতে পারেন। লন্ডনের জনপ্রিয় প্রায় সব জায়গায়ই ভিডিও ব্লগ করেছেন এই দম্পতি। ক্যাম্ব্রিজ, ওয়েস্টফিল্ড শপিং সেন্টার,বাকিংহ্যাম প্যালেস, বরো মা’র্কেট, ক্যামডেন মা’র্কেট,লিটেল ভেনিস,কভেন্ট গার্ডেন, ক্যানারি ওয়ার্ফ কিংবা টেমস নদী বাদ যায়নি কিছুই।

আবার ইউরোপের কিছু জনপ্রিয় স্থানেও রয়েছে তাদের ভ্রমণ ব্লগ। ইটালির ভেনিস ও মিলান, গ্রিসের স্যান্টেরিনি ও মিকোনাস, অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা, জার্মানির বার্লিন, নেদারল্যান্ডের আমস্টারডাম এবং বার্সেলোনার স্পেনেও রয়েছে তাদের রোমাঞ্চকর ভ্রমণ ভিডিও ব্লগ। ৬০ সেকেন্ডের স্পেশাল সেগমেন্ট গুলো আপনাকে নিয়ে যাবে অন্য এক দুনিয়ায়।

সমসাময়িক একটি সাক্ষাৎকারে শেহ্ওয়ার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে জানান, ‘আসলে আমাদের দেশে একটা অমূলক ধারণা ছিল এই বিষয়টি নিয়ে। অনেকেই ভাবেন আম’রা যদি ওয়েস্টার্ন কালচারে মে’য়েদের কিংবা ছে’লেদের বিয়ে করি তাহলে বুঝি বাঙালি হিসেবে আম’রা আমাদের নিজস্ব সত্তা হারিয়ে ফেলবো। এটা একটা ভুল ধারণা। মা’রিয়াতো রীতিমতো বাঙালিয়ানায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। ‘

তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমি কয়েকটা দেশ ভ্রমণ করেছি। সবখানেই তাদের ট্যুরিস্ট স্পট গুলোতে বিদেশিদের বিপুল আনাগোনা থাকে। এসব নিয়ে ইউটিউবে অনেক প্রমোশনাল ভিডিও আছে। তবে আমাদের দেশের যে চ’মৎকার দর্শনীয় স্থানগুলো আছে সেগুলো নিয়ে কেউই সেভাবে ভিডিও বানায়নি। আম’রা চাইবো বাংলাদেশের সুন্দর জায়গাগুলো সবার কাছে তুলে ধরতে।

আম’রা অনেকেই বিদেশে এসে এক ধরনের হীনমণ্যতায় ভুগী। বাংলা ভাষা কিংবা সংস্কৃতিকে লুকিয়ে রাখতে চাই। অনেকে এমন আছেন যে বিদেশে বিয়ে করার পর আর কখনই বাংলা বলতে চান না। এমনকি নিজের জীবন সঙ্গীর সঙ্গেও নন। এটা মোটেই ঠিক না, আমাদের চিন্তাধারার পরিবর্তন ঘটাতে হবে, এবং আমাদের ভিডিওগুলোর মাধ্যমে আম’রা ইতিবাচক এই পরিবর্তনগুলো আনতে পারছি। আমা’র বুকটা গর্বে আর আনন্দে ভোরে যায় যখন আমি দেখি যে আমাদের থেকে অনুপ্রা’ণিত হয়ে এখন অনেক বাংলাদেশি বহুজাতিক দম্পতি তাদের বিদেশী জীবনসঙ্গী/জীবনসঙ্গিনীর সাথে বাংলায় কথা বলছে, তাদেরকে আমাদের সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে।’

ইউটিউব চ্যানেলের ১ লাখ সাবস্ক্রাইবার হওয়ার পর শেহওয়্যার ও মা’রিয়া বাংলাদেশি শি’শু ফাতিহার (৪) ভরণপোষণের দায়িত্ব নেন। প্রতিমাসেই ফাতিহার খরচ বহন করছেন তারা। চিঠিতেও কথা ব বলছেন ফাতিহার সাথে। আগামী চার বছর এভাবেই চালিয়ে যাবেন বলেও আশ্বস্ত করেন শেহওয়্যার।